প্রাচীন বাংলার জনপদ। সাধারণ জ্ঞান

লেখা:

বাংলা নামের অখণ্ড ভূখণ্ডের সৃষ্টি কোনো একক মুহূর্তে হয়নি। হাজার বছরের বিবর্তন, রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং সামাজিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আজকের বাংলাদেশের ভৌগোলিক রূপ তৈরি হয়েছে। প্রাচীনকালে বাংলা অঞ্চলটি কোনো একক কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে ছিল না; বরং ছোট ছোট অনেকগুলো স্বাধীন ও প্রায়-স্বাধীন ভৌগোলিক অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। এদের বলা হতো 'জনপদ'। প্রত্নতাত্ত্বিক সাহিত্য ও প্রাচীন শিলালিপি থেকে বাংলায় প্রায় ১৬টি প্রাচীন জনপদের সন্ধান পাওয়া যায়। বিসিএস, ব্যাংক, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার জন্য এই জনপদগুলোর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস জানা আবশ্যক।

পরীক্ষার প্রস্তুতি টিপস: প্রাচীন জনপদের নাম, তাদের তৎকালীন রাজধানী, বর্তমান জেলা এবং রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সংক্রান্ত প্রশ্ন বিসিএস প্রিলিমিনারিতে প্রতি বছরই ১-২ নম্বর নিশ্চিত করে। এই পোস্টটি সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।

১. প্রাচীন বাংলার ১৬টি জনপদের বিস্তারিত পরিচিতি ও ভৌগোলিক অবস্থান

নিচে প্রাচীন বাংলার প্রধান ১৬টি জনপদের নাম, বর্তমান অবস্থান, প্রাচীন রাজধানী এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সারণীবদ্ধ করা হলো:

জনপদের নাম বর্তমান ভৌগোলিক এলাকা প্রাচীন রাজধানী ঐতিহাসিক বিশেষত্ব ও গুরুত্ব
১. পুণ্ড্র (Pundra) বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর ও জয়পুরহাট পুণ্ড্রনগর / পুণ্ড্রবর্ধন বাংলার সবচেয়ে প্রাচীনতম জনপদ। এর কেন্দ্র ছিল বর্তমান মহাস্থানগড়। এখানে সুপ্রাচীন 'ব্রাহ্মী লিপি' পাওয়া যায়।
২. বঙ্গ (Banga) বৃহত্তর ঢাকা, ফরিদপুর, বিক্রমপুর, ময়মনসিংহ ও যশোর বিক্রমপুর / নাব্য 'বাঙালি' জাতির উৎপত্তি এই জনপদ থেকেই। প্রাচীন বঙ্গ জনপদ দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল— 'নাব্য' ও 'উত্তর বঙ্গ'।
৩. সমতট (Samatata) বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী ও মেহেরপুর অঞ্চল বড় কামতা (রোহিতগিরি) মেঘনা নদীর পূর্ব তীরবর্তী প্লাবনভূমি অঞ্চল। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান শালবন বিহার ও ময়নামতি এই জনপদের অন্তর্গত ছিল।
৪. গৌড় (Gauda) চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, মালদহ, বর্ধমান ও নদীয়া কর্ণসুবর্ণ বাংলার ১ম স্বাধীন নরপতি রাজা শশাঙ্ক গৌড়ের রাজা ছিলেন। এর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (বর্তমান মুর্শিদাবাদ)।
৫. হরিকেল (Harikela) সিলেট, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার হরিকেল শহর (উপকূলীয়) প্রাচীন চীনের পরিব্রাজক ইৎসিং-এর বিবরণীতে পূর্ব ভারতের শেষ সীমানা হিসেবে হরিকেল জনপদের উল্লেখ রয়েছে।
৬. রাঢ় / সুহ্ম (Rarh) ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরবর্তী বর্ধমান ও বীরভূম কোটিবর্ষ / সুহ্মনগর মহাভারতে এই অঞ্চলকে 'সুহ্ম' নামে অভিহিত করা হয়েছে। এটি ছিল জৈন ধর্ম প্রচারের প্রাচীন পীঠস্থান।
৭. বরেন্দ্র (Barendra) বগুড়া, দিনাজপুর, পাবনা, রাজশাহী ও নওগাঁর অংশ পুণ্ড্রবর্ধন সংলগ্ন গঙ্গা ও করতোয়া নদীর মধ্যবর্তী লাল মাটি সমৃদ্ধ উচ্চভূমি অঞ্চল। বরেন্দ্র বিদ্রোহ (কৈবর্ত বিদ্রোহ) এখানে ঘটেছিল।
৮. চন্দ্রদ্বীপ (Chandradwip) বরিশাল, পটুয়াখালী, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি বাকলা / চন্দ্রদ্বীপ মধ্যযুগে এই জনপদটি 'বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ' নামে পরিচিত ছিল। দক্ষিণাঞ্চলের নদীবেষ্টিত জনপদ।
৯. তাম্রলিপ্ত (Tamralipta) মেদিনীপুর ও রূপনারায়ণ নদীর কোলঘেঁষা এলাকা তাম্রলিপ্ত শহর প্রাচীন বাংলার অন্যতম প্রধান ও বিখ্যাত সামুদ্রিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বন্দর।
১০. বিক্রমপুর (Bikrampur) মুন্সিগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চল বিক্রমপুর নগর সেন রাজাদের (বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেন) দ্বিতীয় রাজধানী ও জ্ঞানচর্চার প্রধান কেন্দ্র।
১১. সপ্তগ্রাম (Saptagram) হুগলী ও বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী অংশ সপ্তগ্রাম বন্দর প্রাচীন সমুদ্র বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।
১২. কামরূপ (Kamarupa) ভারতের জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আসামের অংশ প্রাগজ্যোতিষপুর প্রাচীন কামরূপ জনপদটি আসাম ও প্রাচীন উত্তর বাংলার সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত ছিল।
১৩. কঙ্কগ্রাম (Kankagram) বীরভূম ও মুর্শিদাবাদের একাংশ কঙ্কগ্রাম রাঢ় অঞ্চলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় জনপদ।
১৪. নাব্য (Nabya) ফরিদপুর, বরিশাল ও সুন্দরবনের জলাভূমি নাব্য কেন্দ্র বঙ্গ জনপদের দক্ষিণ নিম্ন নদীমাতৃক অংশ।
১৫. ওড়্র (Odra) মেদিনীপুর ও ওড়িশা সীমান্ত এলাকা ওড়্র নগর দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত জনপদ।
১৬. সুহ্ম (Suhma) রাঢ় জনপদের দক্ষিণাঞ্চল সুহ্ম নগর ভাগীরথী নদীর নিম্ন অববাহিকা।
এক নজরে অতি-গুরুত্বপূর্ণ ৩টি তথ্য

১. বাংলার প্রাচীনতম জনপদ: পুণ্ড্র (রাজধানী: পুণ্ড্রনগর/মহাস্থানগড়)।
২. বাংলার ১ম স্বাধীন রাজা: রাজা শশাঙ্ক (গৌড় রাজবংশ, রাজধানী: কর্ণসুবর্ণ)।
৩. বাংলার ১ম নির্বাচিত রাজা: গোপাল (পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা, ৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটান)।

২. প্রাচীন বাংলার রাজবংশ ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসকে প্রধানত ৪টি ঐতিহাসিক যুগে ভাগ করা হয়:

  1. মৌর্য ও গুপ্ত যুগ: সম্রাট অশোকের আমলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার ঘটে। গুপ্ত যুগে বাংলায় স্থায়িত্ব আসে।
  2. রাজা শশাঙ্কের শাসন (গৌড় রাজ্য): সপ্তম শতকে রাজা শশাঙ্ক বাংলার প্রথম সার্বভৌম স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
  3. মাৎস্যন্যায় (অরাজকতার যুগ): শশাঙ্কের মৃত্যুর পর প্রায় ১০০ বছর (৬৫০-৭৫০ খ্রিঃ) বাংলায় কোনো স্থায়ী শাসক ছিল না। এই নৈরাজ্যময় অরাজক অবস্থাকে বলা হয় 'মাৎস্যন্যায়' (বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গিলে ফেলে, তেমন শক্তিমানের অত্যাচার)।
  4. পাল ও সেন রাজবংশ: ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে জনগণ ও প্রধাণ অমাত্যরা মিলে গোপাল-কে রাজা হিসেবে নির্বাচন করেন। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে মাৎস্যন্যায়ের এবং সূচনা হয় ৪০০ বছরের গৌরবময় পাল শাসনের। পাল রাজাদের পর একাদশ শতকে বাংলায় আগমন ঘটে দক্ষিণের সেন বংশের (বিজয় সেন ও বল্লাল সেন)।

৩. প্রাচীন জনপদ ও ইতিহাস সম্পর্কিত বিগত বছরের কুইজ প্রশ্ন ও ব্যাখ্যা

প্রশ্ন ১. প্রাচীন বাংলার কোন জনপদটি সবচেয়ে প্রাচীনতম?
ক) গৌড়
খ) বঙ্গ
গ) পুণ্ড্র
ঘ) হরিকেল
সঠিক উত্তর: গ) পুণ্ড্র
ব্যাখ্যা: পুণ্ড্র হলো বাংলার সবচেয়ে প্রাচীনতম জনপদ। বৈদিক সাহিত্যে প্রথম পুণ্ড্র জাতির উল্লেখ পাওয়া যায়। এর রাজধানী পুণ্ড্রনগর বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ে অবস্থিত।
প্রশ্ন ২. বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম নরপতি কে ছিলেন?
ক) গোপাল
খ) রাজা শশাঙ্ক
গ) ধর্মপাল
ঘ) লক্ষণ সেন
সঠিক উত্তর: খ) রাজা শশাঙ্ক
ব্যাখ্যা: সপ্তম শতকে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই ছিলেন প্রাচীন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম শাসক।
প্রশ্ন ৩. প্রাচীন বাংলায় ১০০ বছরের অরাজক অবস্থাকে কী বলা হয়?
ক) অন্ধকার যুগ
খ) মাৎস্যন্যায়
গ) বরেন্দ্র বিপ্লব
ঘ) সামন্ততন্ত্র
সঠিক উত্তর: খ) মাৎস্যন্যায়
ব্যাখ্যা: শশাঙ্কের মৃত্যুর পর (৬৫০-৭৫০ খ্রিঃ) বাংলায় কোনো শক্তিশালী শাসক ছিল না। আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ও বিশৃঙ্খলাকে কৌটিল্যের ভাষায় 'মাৎস্যন্যায়' বলা হয়।
প্রশ্ন ৪. পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন এবং তিনি কীভাবে ক্ষমতায় আসেন?
ক) ধর্মপাল - যুদ্ধের মাধ্যমে
খ) গোপাল - জনগণের নির্বাচিত হয়ে
গ) দেবপাল - উত্তরাধিকার সূত্রে
ঘ) মহিপাল - বিপ্লবের মাধ্যমে
সঠিক উত্তর: খ) গোপাল - জনগণের নির্বাচিত হয়ে
ব্যাখ্যা: ৭৭০ খ্রিষ্টাব্দে মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটাতে বাংলার প্রজাসাধারণ ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সর্বসম্মতিক্রমে গোপালকে রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন।
প্রশ্ন ৫. চীন দেশের পরিব্রাজক 'হিউয়েন সাং' কার রাজত্বকালে বাংলায় আগমন করেন?
ক) সম্রাট অশোক
খ) সম্রাট হরষবর্ধন ও রাজা শশাঙ্কের সময়ে
গ) দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত
ঘ) সম্রাট আকবর
সঠিক উত্তর: খ) সম্রাট হরষবর্ধন ও রাজা শশাঙ্কের সময়ে
ব্যাখ্যা: চীনা বৌদ্ধ পণ্ডিত ও পরিব্রাজক হিউয়েন সাং ৭ম শতকে (৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে) বাংলায় আগমন করেন এবং প্রায় ২ বছর অবস্থান করে বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার ভ্রমণ করেন।
প্রশ্ন ৬. ফারসি ভাষায় রচিত গ্রন্থ 'আইন-ই-আকবরি'-এর রচয়িতা কে?
ক) গুলবদন বেগম
খ) আবুল ফজল
গ) জিয়াউদ্দিন বারানী
ঘ) আল বেরুনী
সঠিক উত্তর: খ) আবুল ফজল
ব্যাখ্যা: সম্রাট আকবরের সভাসদ পণ্ডিত আবুল ফজল রচিত 'আইন-ই-আকবরি' গ্রন্থে প্রথম সমগ্র অঞ্চলকে 'সুবেহ-ই-বাঙ্গালাহ' বা 'বাংলা' নামে অভিহিত করা হয়।
ফাইনাল রিভিশন পরামর্শ: বিসিএস প্রিলি, পিএসসি নন-ক্যাডার ও ব্যাংক নিয়োগ পরীক্ষার আগে এই জনপদ সারণী ও প্রশ্ন উত্তরসমূহ ২-৩ বার রিভিশন দিন। নিয়মিত প্র্যাকটিস করতে আমাদের সাইটের অনলাইন কুইজ টেস্ট ব্যবহার করুন।

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান:

লেখকের তথ্য: EDu Desk

শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রার্থীদের ক্যারিয়ার নির্দেশক পোর্টাল "ধারাবাহিক জিকে"-এর প্রস্তুতকৃত নিয়মিত পাঠ সামগ্রী।

পাঠকদের মন্তব্য ও প্রশ্নোত্তর

মন্তব্য করার নিয়মাবলী: পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার সংক্রান্ত গঠনমূলক আলোচনা করুন। কোনো বিজ্ঞাপন বা স্প্যামিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বন্ধুদের শেয়ার করুন: